মঙ্গলবার | ২০শে এপ্রিল, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ | ৭ই বৈশাখ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

A National Daily In Bangladesh

কাঁচা চামড়া রপ্তানি করার দ্রুত ইতিবাচক সিদ্ধান্ত নিন

আর কে চৌধুরী

কাঁচা চামড়া রপ্তানি করার দ্রুত ইতিবাচক সিদ্ধান্ত নিন

কোরবানির চামড়া নিয়ে ভানুমতির খেল চলছে কয়েক বছর ধরে। পানির দামে চামড়া কেনার জন্য ট্যানারি মালিকদের পক্ষ থেকে গত কয়েক বছর ধরে অপকৌশলের আশ্রয় নেওয়া হচ্ছে এমন অভিযোগ ওপেন সিক্রেট। পরিণতিতে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা ন্যায্য দামের চেয়ে দশ শতাংশ কিংবা তার চেয়ে কম মূল্যে তাদের কাছে চামড়া বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছে।

কোরবানি যারা করেন তাদের সিংহভাগই চামড়া দান করেন এতিমখানা সংবলিত মাদ্রাসায়। চামড়া বিক্রির অর্থ দিয়ে এতিম ও গরিব শিক্ষার্থীদের সারা বছরের পড়াশোনা, খাওয়া ও অন্যান্য খরচ চলে। চামড়ার দামে ধস নামলে ক্ষতিগ্রস্ত হয় এসব ধর্ম শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। কোরবানির আগে প্রতি বছর চামড়া কেনার জন্য সরকারি নির্দেশনায় ব্যাংকগুলো ট্যানারিগুলোকে ঋণ দেয়।

ট্যানারিগুলোর একাংশ এ ঋণ আত্মসাৎ করাকে কর্তব্য হিসেবে বেছে নেয়। ট্যানারিগুলো চামড়া কেনে আড়তদারদের কাছ থেকে। কিন্তু আড়তদারদের অর্থ সময়মতো শোধ না করা তাদের অভ্যাস হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আড়তদারদের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তারা ট্যানারি মালিকদের কাছে ১৫৩ কোটি টাকা পাবেন। কোরবানিকে সামনে রেখে সরকার ট্যানারিগুলোকে চামড়া কেনার জন্য ৬০০ কোটি টাকা ঋণ দেওয়ার নির্দেশনা দিলেও ব্যাংকগুলো এ টাকা ছাড়ে আগ্রহ দেখাচ্ছে না। ফলে গত কয়েক বছরের মতো এ বছরও চামড়ার দামে ধস নামতে পারে এমন আশঙ্কা দানা বেঁধে উঠছে। চামড়া নিয়ে যে সাংবাৎসরিক অপখেলা চলছে তা বন্ধে কাঁচা চামড়া রপ্তানিতে যে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে তা প্রত্যাহার করা দরকার।

বাংলাদেশের চামড়ার এক বড় অংশ রপ্তানি হয় চীনে। চীন যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য যুদ্ধের কারণে চীনে চামড়া কতটা রপ্তানি করা যাবে তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। বাণিজ্য যুদ্ধ ও করোনার কারণে গত বছরের ৩০০ কোটি টাকার চামড়া স্টকলক হয়ে আছে। এ অবস্থায় কাঁচা চামড়া রপ্তানির সুযোগ দিলে দেশের এই গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানি পণ্যের দামে ধস নামার আশঙ্কা অনেকাংশে ঠেকানো যাবে। চামড়ার ন্যায্যমূল্য পেয়ে লাভবান হবে এতিমখানাগুলো। এ ব্যাপারে সরকারের সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত কাম্য।

চামড়া ও চামড়াজাত শিল্প বাংলাদেশের অন্যতম বৃহত্তম রফতানিমুখী শিল্পখাত। যত মন্দাই হোক, এ খাত থেকে গত অর্থবছরেও বিলিয়ন ডলারের রফতানি আয় হয়েছে। দেশের চামড়া শিল্পে উৎপাদিত পণ্যের শতকরা ৮৫ভাগই বিদেশে রফতানি হয়, যা আন্তর্জাতিক বাজার চাহিদার শতকরা ১০ ভাগের বেশি পুরণ করে। গত এক দশকে কোরবানির পশুর কাঁচা চামড়ার মূল্য অর্ধেকেরও নিচে নেমে এসেছে। ২০১২-১৩ অর্থবছরে যেখানে কোরবানির পশুর চামড়ার মূল্য ছিল প্রতি বর্গফুট ৯০ টাকা, সেখানে গত ৩ বছর ধরে তা ৪৫টাকা নির্ধারন করা হলেও প্রান্তিক বিক্রেতারা তা পায়নি।

শরিয়তের বিধান অনুসারে কোরবানির পশুর চামড়া বা এর মূল্যের হক এতিম ও হতদরিদ্র মানুষের। সিন্ডিকেটেড কারসাজি বন্ধ করতে এবং এতিম-মিসকিন ও ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর টিকে থাকার অন্যতম অবলম্বন হিসেবে কোরবানির চামড়ার ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করার কোনা কার্যকর পদক্ষেপ না থাকায় দেশের লাখ লাখ এতিম, হাজার হাজার কওমী মাদরাসার লিল্লাহ বোর্ডিং ও গ্রামীন জনপদের অসহায়-দরিদ্র মানুষকে অশেষ বঞ্চনার শিকার হতে হচ্ছে। কোরবানির পশুর চামড়া থেকে প্রাপ্ত অর্থ এসব ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান এবং এতিম-মিসকিন ও গ্রামীন দরিদ্র জনগোষ্ঠির সামাজিক নিরাপত্তায় বড় ভ’মিকা পালন করে থাকে। কোরবানির পশুর চামড়ার মূল্য থেকে বঞ্চিত হওয়ার কারণে দেশের দরিদ্র জনগোষ্ঠির শিক্ষা ও জীবনমান উন্নয়নে নেতিবাচক প্রভাব সৃষ্টি করেছে।

কোরবানির পশুর চামড়া মৌসুমি ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে স্থানীয় ব্যবসায়ীদের হাত ঘুরে ঢাকার আড়তে আসে। আড়তদাররা এসব চামড়া কিনে সাভারের ট্যানারি শিল্প নগরীতে সরবরাহ করে থাকেন। স্থানীয় ব্যবসায়ী, ঢাকার আড়তদার ও ট্যানারি মালিক এই তিন পক্ষের মধ্যে বড় অঙ্কের লেনদেন হয়ে থাকে।

দেশে প্রতিবছর যে পরিমাণ পশুর চামড়া সংগ্রহ করা হয়, তার ৫০ থেকে ৫৫ শতাংশ আসে ঈদ-উল-আজহায়। কোরবানিতে ভাল ও সুস্থ গরু জবাই হয় বলে এই চামড়ার মানও ভাল থাকে। ব্যবসায়ীদেরও এই চামড়া সংগ্রহে আগ্রহ থাকে। চামড়ার দাম এবার আরও কমানোয় ট্যানারি মালিক ও এ শিল্প খাতে সংশ্লিষ্টরা লাভবান হলেও এতিম, অসহায়, এমনকি ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন।

কোরবানির চামড়া আমাদের দেশের সম্পদ। সম্ভাবনাময় চামড়া শিল্পের স্বার্থে কোরবানির চামড়া নিয়ে অসাধু বাণিজ্য বন্ধ করা জরুরী। দেশে চামড়ার দাম না পেলে চোরাই পথে পাচার হওয়ার প্রবণতা রয়েছে। বর্ডার গার্ড বিজিবিকেও সতর্ক থাকতে হবে। চামড়ার বাজার উন্নত ও স্থিতিশীল রাখা জাতীয় অর্থনীতির স্বার্থেই প্রয়োজন।

লেখক: মুক্তিযোদ্ধা ও শিক্ষাবিদ, সাবেক চেয়ারম্যান রাজউক, উপদেষ্টা, সেক্টর কমান্ডার্স ফোরাম, প্রতিষ্ঠাতা ও সভাপতি আর কে চৌধুরী বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ, সভাপতি বাংলাদেশ ম্যাচ ম্যানুফ্যাকচারার এসোসিয়েশন, সদস্য এফবিসিসিআই, মহান মুক্তিযুদ্ধে ২ ও ৩ নং সেক্টরের রাজনৈতিক উপদেষ্টা।

Facebook Comments

Posted ৩:৫৫ পূর্বাহ্ণ | সোমবার, ২৭ জুলাই ২০২০

dailymatrivumi.com |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আর্কাইভ

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০১১
১২১৩১৪১৫১৬১৭১৮
১৯২০২১২২২৩২৪২৫
২৬২৭২৮২৯৩০  
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক
মোহাম্মদ নুরুজ্জামান মুন্না
প্রকাশক ও ব্যবস্থাপনা সম্পাদক
মশি শ্রাবন
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়

রূপায়ন করিম টাওয়ার, ৮০ কাকরাইল, ভিআইপি রোড, রমনা ঢাকা।
ফোন : ০২৪৮৩২২৮৮০
email : matrivumi@gmail.com

মিরর মাল্টি মিডিয়া প্রডাকশন লি: এর পক্ষে প্রকাশক মশি শ্রাবন কর্তৃক বি.এস.প্রিন্টিং প্রেস, ৫২/২ টয়েনবী সার্কুলার রোড (মামুন ম্যানশন, গ্রাউন্ড ফ্লোর), থানা-ওয়ারী, ঢাকা থেকে মুদ্রিত ও প্রকাশিত।